আজ ১৩ জুন। সিরাজগঞ্জের কৃতিসন্তান, ১৯৭১ সালের আগে পাকিস্তানের সাবেক কেন্দ্রীয় শিল্প ও প্রাকৃতিক সম্পদ মন্ত্রী, বিশিষ্ট রাজনীতিক, আইনজীবী ও সমাজসেবক আব্দুল্লাহ আল মাহমুদের ৫১তম মৃত্যুবার্ষিকী।
রাজনীতি, সমাজসেবা, শিক্ষা বিস্তার এবং শিল্পায়নে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি আজও সিরাজগঞ্জবাসীর স্মৃতিতে অম্লান হয়ে আছেন। একসময় ব্রিটিশ ভারত, পাকিস্তান এবং তৎকালীন পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী এই ব্যক্তিত্বের জীবন ও কর্ম নতুন প্রজন্মের কাছে অনেকটাই অজানা।

শিয়ালকোলের কয়েলগাঁতী থেকে জাতীয় রাজনীতিতে
১৯০০ সালে সিরাজগঞ্জ শহর থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে শিয়ালকোল ইউনিয়নের কয়েলগাঁতী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ। তাঁর পিতা দেরাজউদ্দিন তালুকদার ছিলেন শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবক।
সিরাজগঞ্জে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে তিনি রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে আইএ পাস করেন। পরে কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ থেকে বিএ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরবিতে এমএ ও আইন বিষয়ে বিএল ডিগ্রি অর্জন করেন।
ছাত্রজীবনেই রাজনীতিতে সম্পৃক্ততা
কলকাতায় অবস্থানকালে তিনি মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ, লিয়াকত আলী খান, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মতো উপমহাদেশের খ্যাতিমান নেতাদের সংস্পর্শে আসেন।
১৯২৪ সালে সিরাজগঞ্জে ফিরে আইন পেশা শুরু করেন। পাশাপাশি সমাজসেবা ও রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন।
পৌর চেয়ারম্যান থেকে আইনসভার সদস্য
তিনি সিরাজগঞ্জ পৌরসভার প্রথম ওয়ার্ড চেয়ারম্যান, পরে পৌরসভার চেয়ারম্যান এবং তৎকালীন পাবনা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
১৯৩৭ সালে অবিভক্ত বাংলার বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলির সদস্য (এমএলএ) নির্বাচিত হয়ে আইন প্রণেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। পরে তিনি পার্লামেন্টারি সেক্রেটারিও নিযুক্ত হন।

পাকিস্তান আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
ব্রিটিশ ভারতের মুসলিম স্বার্থরক্ষার আন্দোলন এবং পরবর্তী পাকিস্তান আন্দোলনে আব্দুল্লাহ আল মাহমুদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৪০ সালের ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের সম্মেলনে সিরাজগঞ্জের প্রতিনিধি হিসেবে অংশগ্রহণ করেন তিনি। ১৯৪২ সালে সিরাজগঞ্জে অনুষ্ঠিত সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ সম্মেলনের আহ্বায়কের দায়িত্বও পালন করেন। ওই সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ।
ব্রিটিশদের দেওয়া উপাধি প্রত্যাখ্যান
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে তিনি ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া ‘খান বাহাদুর’ উপাধি প্রত্যাখ্যান করেন। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে একসময় ব্রিটিশ প্রশাসনের হাতে গ্রেপ্তারও হন। দেশ বিভাগের পর স্বাধীন পাকিস্তানে তিনি প্রথমে সিরাজগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
১৯৪৮ সালে পাকিস্তান কেন্দ্রীয় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়ে জয়েন্ট চিফ হুইপের দায়িত্ব পান। একই বছর কলকাতায় পাকিস্তানের ডেপুটি হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন।
১৯৬২ ও ১৯৬৫ সালে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর ১৯৬৩ সালে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শিল্প ও প্রাকৃতিক সম্পদ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত তিনি ওই দায়িত্ব পালন করেন।
শিল্পায়ন ও উন্নয়নে অবদানড়
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী থাকাকালে উত্তরবঙ্গে ছয়টি সুগার মিল, ঈশ্বরদীতে আলহাজ স্টিল মিল, পাকশী পেপার মিল, সিরাজগঞ্জের ওপেল বিস্কুট ফ্যাক্টরি এবং কওমী জুট মিল সম্প্রসারণসহ বিভিন্ন শিল্প প্রকল্প বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখেন।
তাঁর উদ্যোগে সিরাজগঞ্জ কলেজের দুটি পাকা ভবন নির্মাণ, শহর রক্ষা বাঁধ এবং যমুনা নদী খননের বৃহৎ প্রকল্প অনুমোদন লাভ করে। যদিও স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় যমুনা খনন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হয়নি।

শিক্ষা বিস্তারে অনন্য অবদান
সিরাজগঞ্জ মুসলিম হাই স্কুল, ভিক্টোরিয়া হাই স্কুল, সালেহা ইসহাক গার্লস স্কুল, সিরাজগঞ্জ কলেজ ও ইসলামিয়া কলেজের উন্নয়নে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছিল।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য ছিলেন তিনি।
কর্মময় জীবনের অবসান
১৯৬৯ সালের পর বার্ধক্যজনিত কারণে তিনি সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে যান। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর ১৯৭৫ সালের ১৩ জুন মৃত্যুবরণ করেন।
মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী আবেদা আল মাহমুদ, দুই পুত্র, তিন কন্যাসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে যান। তাঁর বড় ছেলে ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু পরবর্তীতে সংসদ সদস্য, মন্ত্রী এবং বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বর্তমান বিএনপি সরকারের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
স্মৃতিকে ধরে রেখেছে সিরাজগঞ্জ
আব্দুল্লাহ আল মাহমুদের স্মৃতিকে ধরে রাখতে সিরাজগঞ্জে একটি সড়কের নামকরণ করা হয়েছে ‘আল মাহমুদ এভিনিউ’। এছাড়া শিয়ালকোলে আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ মেমোরিয়াল হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ, বাগবাটীতে আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ ডিগ্রি কলেজ, সিরাজগঞ্জ আইনজীবী সমিতির আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ হলরুম এবং ঢাকায় আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ মেমোরিয়াল ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচিত করার দাবি

সিরাজগঞ্জের ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিরা মনে করেন, আব্দুল্লাহ আল মাহমুদের মতো কৃতিমান ব্যক্তিত্বদের জীবন ও কর্ম নতুন প্রজন্মের সামনে আরও বেশি করে তুলে ধরা প্রয়োজন। জেলার রাজনৈতিক, সামাজিক, শিক্ষাগত ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে তাঁর অবদান ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে থাকবে।
আজ তাঁর ৫১তম মৃত্যুবার্ষিকীতে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে এই কৃতিমান ব্যক্তিত্বকে স্মরণ করছেন এবং তাঁর রুহের মাগফিরাত কামনা করছেন।
Tags: আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ