সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার সোনাকান্ত বিলে দুই বছর পর আবারও ব্যাপকভাবে ফুটেছে পদ্মফুল। গোলাপি ও লাল পদ্মে ছেয়ে যাওয়া বিস্তীর্ণ বিলটি এখন প্রকৃতিপ্রেমী ও দর্শনার্থীদের কাছে হয়ে উঠেছে আকর্ষণীয় এক মৌসুমি পর্যটনকেন্দ্র। প্রতিদিনই বিলের সৌন্দর্য দেখতে সেখানে ভিড় করছেন স্থানীয় মানুষসহ দূর-দূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীরা।
উল্লাপাড়া উপজেলার হাটিকুমরুল ইউনিয়নের আমডাঙ্গা গ্রামে সোনাকান্ত বিলের অবস্থান। ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ বিঘা নিচু জমি বর্ষা মৌসুমে পানিতে তলিয়ে বিলের রূপ নেয়। এসব জমিতে বছরে একবার ইরি-বোরো ধানের আবাদ হয়। বছরের বাকি সময় জমিগুলো পানির নিচে থাকে। সড়াতৈল, আমডাঙ্গা, অলিপুর ও বাগদা গ্রামের বাসিন্দাদের মালিকানাধীন এসব জমিই বর্ষায় পদ্মে ভরে ওঠে।
স্থানীয়রা বলছেন, এবার বন্যা না হলেও টানা বৃষ্টিতে বিলটি পানিতে পূর্ণ হয়েছে। আর পর্যাপ্ত পানি পাওয়ায় পদ্মফুলও ব্যাপকভাবে ফুটেছে। চারদিকে গোলাপি ও লাল পদ্মের সমারোহে বদলে গেছে বিলের চেহারা।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল হান্নান বলেন, ২০২২ সালেও সোনাকান্ত বিলে কিছু পদ্মফুল ফুটেছিল। তবে এবারের মতো এত বেশি ফুল তখন দেখা যায়নি। ২০২৩ সালে বন্যা না হওয়ায় পদ্মও তেমন ফোটেনি। এবার টানা বৃষ্টিতে বিল পানিতে পূর্ণ হওয়ায় প্রচুর পদ্মফুল ফুটেছে।
সড়াতৈল স্কুলের প্রধান শিক্ষক আব্দুল মান্নান তালুকদার জানান, শুরুতে প্রাকৃতিকভাবে বিলে দু-একটি পদ্মগাছ জন্মেছিল। পরে ধীরে ধীরে তা পুরো জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়ে। ২০১৪ সাল থেকে সোনাকান্ত বিলে উল্লেখযোগ্যভাবে পদ্মফুল ফুটতে শুরু করে। যে বছর পানি বা বন্যা কম হয়, সে বছর পদ্মফুলও তুলনামূলক কম দেখা যায়। এবার প্রচুর বৃষ্টির কারণে বিল পানিতে পূর্ণ হওয়ায় পদ্মের সমারোহ তৈরি হয়েছে।
সোনাকান্ত বিলের পদ্ম এখন স্থানীয়দের পাশাপাশি সিরাজগঞ্জ শহর ও আশপাশের এলাকার মানুষেরও আগ্রহের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। প্রতিদিনই পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের নিয়ে সেখানে ছুটছেন দর্শনার্থীরা। কেউ পদ্মের সৌন্দর্য উপভোগ করছেন, কেউ তুলছেন ছবি।
সিরাজগঞ্জ শহর থেকে সোনাকান্ত বিলে ঘুরতে আসা সুমাইয়া খাতুন, সাদিয়া, রাব্বি ও মোস্তাক বলেন, চারদিকে সারি সারি গোলাপি ও লাল পদ্মফুল, তার ফাঁকে পানির ওপর ভাসমান সবুজ পাতা, সব মিলিয়ে দৃশ্যটি অত্যন্ত আকর্ষণীয়। শহরের কোলাহল থেকে দূরে এসে এখানে অন্যরকম শান্ত পরিবেশ পাওয়া যায়।
তবে ভালো রাস্তা ও নৌকার ব্যবস্থা না থাকায় ভোগান্তির কথাও জানান তারা। তাদের মতে, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করা গেলে সোনাকান্ত বিলটি আরও আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
পদ্মফুল দেখতে প্রতিদিনই মানুষ বিলে আসছেন বলে জানান সাবেক ইউপি সদস্য সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, উলিপুর-সড়াতৈল আঞ্চলিক সড়ক থেকে বিলটির দূরত্ব আধা কিলোমিটারের কিছু বেশি। কিন্তু বিল পর্যন্ত যাওয়ার ভালো রাস্তা নেই। দর্শনার্থীদের মেঠোপথ ধরে বিলপাড়ে যেতে হয়। বৃষ্টির দিনে এ পথে চলাচল আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
স্থানীয়দের মতে, বিলের সৌন্দর্যকে কাজে লাগিয়ে এখানে পর্যটন সুবিধা তৈরি করা সম্ভব। বিলের যাতায়াতের রাস্তা উন্নত করা, নিরাপদ নৌযানের ব্যবস্থা এবং দর্শনার্থীদের জন্য বসার জায়গা তৈরি করা গেলে বর্ষাকালে এটি একটি সম্ভাবনাময় স্থানীয় পর্যটনকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
সোনাকান্ত বিলের মৌসুমি সৌন্দর্য স্থানীয় কিছু অস্বচ্ছল পরিবারের শিশু-কিশোরদের জন্য আয়ের সুযোগও তৈরি করেছে। গ্রামের সাজু ও রিতা জানান, তারা বিল থেকে পদ্মফুল তুলে হাটবাজার ও দর্শনার্থীদের কাছে বিক্রি করে। প্রতিটি ফুল ১০ থেকে ১৫ টাকায় বিক্রি হয়।
তামিম ও সোহেল নামে আরও দুই শিশু জানায়, পদ্মগাছের কাঁটার আঘাত সহ্য করে তারা প্রতিদিন ফুল সংগ্রহ করে। এসব ফুল বিক্রি করে দৈনিক ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত আয় হয়। শ্রাবণ ও ভাদ্র, এই দুই মাস সাধারণত তারা ফুল তুলতে পারে। বিলের জমির মালিকরা কখনো এতে বাধা দেন না বলেও তারা জানায়।
বিলের জমির মালিকদের মধ্যে বাগদা গ্রামের নজরুল ইসলাম ও আমডাঙ্গা গ্রামের সামসুল হক বলেন, বর্ষা এলেই বহু বছর ধরে এই বিলে পদ্মফুল ফোটে। পুরো বিলজুড়ে সারি সারি পদ্মফুল ফুটলে এর সৌন্দর্য ভিন্ন মাত্রা পায়।
তাদের ভাষায়, পানির ওপর ভাসমান পদ্মপাতাগুলো দূর থেকে সবুজ গালিচার মতো মনে হয়। এর মধ্যে ফুটে থাকা গোলাপি ও লাল পদ্ম বিলের সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দেয়।

উল্লাপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুবর্ণা ইয়াসমিন সুমী বলেন, পদ্ম একটি জলজ উদ্ভিদ। বিভিন্ন পাখির মাধ্যমে এর বীজ এক স্থান থেকে আরেক স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। পরে সেই বীজ থেকে গাছ জন্ম নিয়ে ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়।
তিনি জানান, এবার সোনাকান্ত বিলে প্রচুর পদ্মফুল ফুটেছে এবং তিনি নিজেও বিলটি পরিদর্শন করেছেন। সাময়িক সময়ের জন্য হলেও পদ্মফুলে সেজে সোনাকান্ত বিল এখন এ অঞ্চলের মানুষের কাছে একটি নান্দনিক দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সোনাকান্ত বিলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষা করে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ ও পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তোলা হলে এটি সিরাজগঞ্জের অন্যতম আকর্ষণীয় মৌসুমি পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পেতে পারে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে পদ্মফুলের এই অপরূপ দৃশ্যকে ঘিরে পরিকল্পিত উদ্যোগ নিলে স্থানীয় মানুষের আয় ও ক্ষুদ্র পর্যটন ব্যবসারও সুযোগ তৈরি হতে পারে।
Tags: সোনাকান্ত বিল
পরবর্তী নিউজ লোড হচ্ছে...