সিরাজগঞ্জ শহর থেকে রায়পুরের দিকে গেলে এখনো চোখে পড়ে লম্বা টিনের ছাউনি আর বন্ধ গেট। ভেতরে যন্ত্র চুপ। একসময় এই মিলের ভোঁ শুনে আশপাশের কয়েকটা পাড়ার সকাল শুরু হতো। এখন সেখানে পাহারাদারের হাঁটাচলা ছাড়া বিশেষ কিছু নেই।
শুরুটা ১৯৬০ সালে
১৯৬০ সালে রায়পুর এলাকায় প্রায় ৭৫ একর জমির ওপর কারখানাটি চালু হয়। নাম ছিল নর্দান পিপলস জুট মিল। স্বাধীনতার পর জাতীয়করণের সময় নাম বদলে হয় কওমী জুট মিল, পরে জাতীয় জুট মিল। ভালো সময়ে মাসে ৫০ থেকে ৬০ টন পাট ঢুকত কারখানায়। এখানকার পাটপণ্য দেশের বাজারে যেত, কিছু যেত বিদেশেও। মিলকে ঘিরে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের কাজ চলত। উত্তরবঙ্গের বড় শিল্প কারখানাগুলোর একটি হিসেবেই এর পরিচিতি ছিল।
কয়েকবার থেমে যাওয়া
প্রথম ধাক্কা আসে ২০০৭ সালে। দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা আর টাকার টানাটানিতে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। শ্রমিকরা রাস্তায় নামেন, আন্দোলন চলে কয়েক বছর। ২০১১ সালে মিল আবার চালু হয়।
কিন্তু ২০২০ সালের ১ জুন লোকসান আর কাঁচামালের সংকট দেখিয়ে দ্বিতীয়বার তালা পড়ে। ২০২২ সালে কুষ্টিয়ার রশিদ গ্রুপ কুড়ি বছরের জন্য মিলটি লিজ নেয়। কিছুদিন চাকা ঘোরে। তারপর শ্রমিকদের বেতন-ভাতা বাকি রেখেই ২০২৪ সালে তারা কাজ গুটিয়ে নেয়।
বন্ধ কারখানার খরচ
উৎপাদন নেই, তবু খরচ থামেনি। নিরাপত্তা, যন্ত্র দেখাশোনা আর দাপ্তরিক কাজ চালাতে এখনো ১৮৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলে দায়িত্বে আছেন। তাঁদের বেতন, বিদ্যুৎ বিল আর অন্য খরচ মিলিয়ে প্রতি মাসে যাচ্ছে ৬৫ থেকে ৭০ লাখ টাকা। বছরে আট কোটির বেশি। আয়ের ঘরে শূন্য। এদিকে বছরের পর বছর পড়ে থেকে কোটি টাকার যন্ত্রপাতিতে মরিচা ধরছে।
পুরনো শ্রমিকদের জীবনও বদলে গেছে। মিল চালু থাকতে সপ্তাহে চার-পাঁচ হাজার টাকা আয় হতো, তাতে সংসার চলত। এখন কেউ দিনমজুরি করছেন, কেউ ঘটকালি।
নতুন চুক্তি
গত ১১ আগস্ট সচিবালয়ে বিজেএমসির সঙ্গে ইজারা চুক্তি সই হয়েছে। সিরাজগঞ্জের জাতীয় জুট মিলস ও খুলনার স্টার জুট মিলস নিয়েছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ, প্লাটিনাম জুবিলী জুট মিলস নিয়েছে হ্যামকো গ্রুপ। সরকারি হিসাব বলছে, এই তিন মিল চালু হলে অন্তত ১১ হাজার ৬২৯ জনের কর্মসংস্থান হবে আর বছরে টার্নওভার দাঁড়াবে প্রায় ১ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা।
বিজেএমসির উৎপাদন বন্ধ ২৫টি মিলের মধ্যে ২০টি বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১৪টির দখল বুঝিয়ে দেওয়া শেষ, উৎপাদন শুরু হয়েছে ৯টিতে।
যে প্রশ্নগুলো ঝুলে আছে
কাগজে চুক্তি হলো। মাঠের প্রশ্ন আলাদা।
রশিদ গ্রুপের সময়ের বকেয়া বেতন কে দেবে, তার মীমাংসা এখনো শোনা যায়নি। পুরনো শ্রমিকদের কতজন নতুন ব্যবস্থাপনায় কাজ ফিরে পাবেন, সেটাও পরিষ্কার নয়। তৃতীয় প্রশ্নটা পাটচাষিদের নিয়ে। মিল চালু হলে আশপাশের চাষির পাট কেনা হবে, নাকি কাঁচামাল আসবে বাইরে থেকে। এই তিনটির উত্তরের ওপরই নির্ভর করছে চুক্তিটা সিরাজগঞ্জের অর্থনীতিতে কতটা ছাপ ফেলবে।

সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান বাচ্ছু মনে করিয়ে দেন, বিশ্ববাজারে পরিবেশবান্ধব পাটপণ্যের চাহিদা এখন বাড়ছে। সেই চাহিদা ধরতে পারলে মিলের চাকা ঘোরার সঙ্গে চাষির ঘরেও টাকা ঢুকবে।
রায়পুরের গেটের সামনে দাঁড়ানো মানুষগুলো অবশ্য চুক্তির খবর শুনে অভ্যস্ত। তাঁরা অপেক্ষা করছেন কারখানার শব্দটার জন্য।
Tags: কওমী জুট মিল
পরবর্তী নিউজ লোড হচ্ছে...