মাহমুদপুর, সিরাজগঞ্জ পৌরসভার এক নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত বিরাট মহল্লা। দীর্ঘদিন ধরে এ জায়গার বদনাম ছিল ভীতিকর, কুখ্যাতি আর অন্ধকারের প্রতীক হিসেবে। শহরের কেন্দ্র থেকে কিছুটা বাইরে এবং বিরাট রেলওয়ে সম্পত্তির পাশে হওয়ায় জায়গাটি হয়ে উঠেছিল এক সুবিধাজনক ‘ট্রানজিট পয়েন্ট’। দক্ষিণে রায়পুর রেল জংশন আর উত্তরে সিরাজগঞ্জ বাজার স্টেশন, মাঝখানে ছিল মাহমুদপুর।
রেল যোগাযোগের এ সুবিধাকে ব্যবহার করেই চোরাকারবারিদের উত্থান। প্রথমে ভারতীয় শাড়ির কালোবাজারি, পরে নব্বইয়ের দশকে ভারতীয় ফেনসিডিলের ভয়ঙ্কর দখল। দুই হাজার সালের পর যুক্ত হলো ইয়াবা আর হেরোইন। মাদক কেনাবেচার উন্মুক্ত দৃশ্য হয়ে ওঠে প্রতিদিনের বাস্তবতা। বহিরাগত নেশাগ্রস্তদের আনাগোনায় স্থানীয়রা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। পরিবারগুলো লজ্জিত হতো নিজেদের পরিচয় দিতে। এমনকি বিয়ে-শাদীও ভেঙে যেত কেবল এই এলাকার বাসিন্দা হওয়ার কারণে। মাহমুদপুরের নাম পরিচিত হয়ে উঠেছিল সিরাজগঞ্জের ‘মাদক রাজধানী’ হিসেবে।

প্রতিরোধের শুরু
মাদকের আগ্রাসন আর সামাজিক বঞ্চনার এই ভয়াবহ পরিস্থিতি চলতে থাকে বহু বছর। তবে সময়ের সাথে সাথে এলাকার সচেতন মানুষ প্রতিবাদে নামতে শুরু করে। এলাকাবাসী আর প্রশাসনের যৌথ প্রতিরোধ, অভিযান আর কঠোর পদক্ষেপে ধীরে ধীরে কমতে থাকে মাদকের আগ্রাসন। সংঘর্ষ, ক্রসফায়ার, এনকাউন্টারের ভয়ংকর দিনগুলো পেরিয়ে আসে এক নতুন আলো। ২০১৯ সালের পর থেকে বদলে যেতে থাকে মাহমুদপুরের চিত্র। প্রকাশ্যে মাদক কেনাবেচার দৃশ্য প্রায় বন্ধ হতে থাকে।
ওপেল গার্ডেন: পরিবর্তনের সূচনা
পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে এক আবাসিক প্রকল্প—ওপেল গার্ডেন। সিরাজগঞ্জ শহরের মোক্তারপাড়ার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী এ কে এম আনোয়ারুল ইসলাম ও খোরশেদ আলম ১৯৬৪ সালে এখানে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘ওরিয়েন্টাল বিস্কুট এন্ড ব্রেড ফ্যাক্টরি’, যা সবার কাছে ‘ওপেল বিস্কুট’ নামেই পরিচিত ছিল। তবে সময়ের সাথে প্রতিষ্ঠানটি অলাভজনক হয়ে পড়ে এবং বন্ধ হয়ে যায়।
২০০২ সালে খোরশেদ আলমের পরিবার ১১ বিঘার সেই কারখানার জায়গাকে ৭০টি আবাসিক প্লটে রূপান্তর করে। শুরু হয় ‘ওপেল গার্ডেন’ আবাসিক প্রকল্পের যাত্রা। ধীরে ধীরে এখানকার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে।

অ্যাডভোকেট মোঃ সাখাওয়াত হোসেন
বর্তমানে এখানে সরকারি-বেসরকারি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, ব্যাংক কর্মকর্তা, সরকারি দপ্তরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বসবাস করছেন। বর্তমানে এটি সিরাজগঞ্জের একটি অভিজাত এলাকা হিসেবে সুপরিচিত।
১৭ সদস্যের পরিচালনা পর্ষদ আজও নিয়মিতভাবে এ আবাসিক এলাকার উন্নয়ন দেখভাল করছে। সভাপতি আলহাজ্জ গোলাম মোস্তফা এবং সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোঃ সাখাওয়াত হোসেনের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে একটি শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ আবাসিক সমাজ।
অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন জানান, ৭০টি প্লটের মধ্যে ৩৫টিতেই বহুতল ভবন হয়েছে। বহু পরিবার এখানে নিরাপদে বসবাস করছে। এখানে ২০-২২ বছর ধরে কোন ধরনের মাদকের প্রভাব পড়েনি।
বিদ্যাকোষ আদর্শ পাঠাগার: নতুন প্রজন্মের আশার আলো

মাহমুদপুরের পরিবর্তনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে তরুণ প্রজন্ম। যখন কুখ্যাতি আকাশচুম্বি, তখন কয়েকজন অদম্য তরুণ এগিয়ে আসে বইমুখী সমাজ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে। তারা গড়ে তোলে ‘বিদ্যাকোষ আদর্শ পাঠাগার’।

২০২১ সালের ২ ফেব্রুয়ারি “বই পড়ি, আলোকিত সমাজ গড়ি” স্লোগান নিয়ে পাঠাগারটি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বই সংগ্রহ করা হয়। আজ সেখানে ছড়া, গল্প, কবিতা, ইসলামী সাহিত্যসহ প্রায় এক হাজার বই আছে। জাতীয় ও স্থানীয় তিনটি দৈনিক পত্রিকাও রাখা হয়।

এম এ মতিন সজীব, প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, বিদ্যাকোষ আদর্শ পাঠাগার
এ পাঠাগারের উদ্যোগে শিশু-কিশোরদের মধ্যে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, ছড়া পাঠ, খেলাধুলার আয়োজন করা হয়। প্রতিবেদন তৈরির সময়ও সেখানে পাঠরত ছিল বেশকিছু পাঠক।
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এম এ মতিন সজীব জানান, শিগগিরই এখানে একটি ল কর্নার যুক্ত করা হবে, যেখানে আইনের বই থাকবে এবং অসহায় মানুষদের জন্য বিনামূল্যে আইনি পরামর্শ দেয়া হবে। সমাজের মানুষজন ও প্রশাসনের সহায়তা পেলে আরও নানামুখী ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব বলেও জানান তিনি।
খেলাধুলা: অন্ধকারের মাঝেও আলো
যখন মাদক ছিল চরম উৎপাতের শীর্ষে, তখনো মাহমুদপুরের মাঠে চলত খেলাধুলার চর্চা। ফুটবল, ক্রিকেট আর নানা প্রতিযোগিতা মুখরিত করত শিশু-কিশোরদের। ১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত “মাহমুদপুর রিক্রিয়েশন ক্লাব” ৮০-৯০ দশক থেকেই জেলার ক্রীড়াঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।

যদিও মাদকের ‘রমরমা’ সময়ে ক্লাব সংশ্লিষ্ট কিছু মানুষের বিরুদ্ধে মাদককে পৃষ্টপোষকতার অভিযোগ উঠেছিল, তারপরও সার্বিকভাবে এই ক্লাব খেলাধুলার মাধ্যমে এলাকায় ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে।
জাতীয় দলে মাহমুদপুরের তারকা
মাহমুদপুরের খেলাধুলার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় গৌরব—বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের তারকা ফয়সাল আহমেদ ফাহিম। মাহমুদপুরের মাদক কুখ্যাতি যখন তুঙ্গে, তেমনই এক সময়ে ২০০২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি জন্ম নেন তিনি। পিতা মোঃ ফারুক খান ও মাতা মোছাঃ ফুলোরা খাতুনের আদরের ধন ফাহিম স্থানীয় মাঠে খেলে বড় হয়ে ধীরে ধীরে বয়সভিত্তিক জাতীয় দলে জায়গা করে নেন। ২০২১ সালে মালদ্বীপের বিপক্ষে জাতীয় দলে অভিষেক হয় তার। এরপর থেকে তিনি নিয়মিত খেলছেন লেফট উইঙ্গার ও সেন্টার ফরোয়ার্ড পজিশনে।

মাহমুদপুরে ফাহিমের বাড়ি
ফাহিম এখন মাহমুদপুরের কিশোরদের স্বপ্ন। তারা দেখে—অন্ধকার পরিবেশে থেকেও আলোর লক্ষ্যে সাফল্যের পথে হাঁটা যায়, সুনাম আনা যায় এলাকার।
নতুন মাহমুদপুর: একটি মানবিক সাফল্যের গল্প
আজ মাহমুদপুর আর কুখ্যাতির নাম নয়, বরং পরিবর্তনের প্রতীক। ওপেল গার্ডেনের আধুনিক আবাসিক জীবন, বিদ্যাকোষ পাঠাগারের জ্ঞানচর্চা, মাঠভরা খেলাধুলা—সব মিলিয়ে বদলে গেছে পুরো মহল্লার চিত্র।
মাহমুদপুরের মানুষ এখন বিশ্বাস করে, কোনো সমাজ যত অন্ধকারেই নিমজ্জিত থাকুক না কেন, একতা, শিক্ষা, খেলাধুলা আর মানবিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে নতুন পথ তৈরি করা সম্ভব। সিরাজগঞ্জ তথা বাংলাদেশের জন্য মাহমুদপুর আজ এক মানবিক সাফল্যের গল্প।
Tags: ফয়সাল আহমেদ ফাহিম, মাহমুদপুর, সিরাজগঞ্জ