বাংলাদেশের শস্যভান্ডারখ্যাত চলনবিল অঞ্চলের উর্বর পলিমাটি ও অনুকূল আবহাওয়ার সুবিধা কাজে লাগিয়ে সরিষা উৎপাদনে টানা শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে সিরাজগঞ্জ। চলতি অর্থবছরে জেলায় ১ লাখ ৪৬ হাজার টন সরিষা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
কৃষি বিভাগ আশা করছে, এটি গত বছরের ১ লাখ ২৮ হাজার টনের রেকর্ডও ছাড়িয়ে যাবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এ অর্থবছরে জেলায় ৯০ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে। তাড়াশ, উল্লাপাড়া, শাহজাদপুর ও বেলকুচি উপজেলার বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন শুধু সরিষার হলুদ সমারোহ। এই উৎপাদনকে ঘিরে জেলায় প্রায় ১ হাজার ২৫০ কোটি টাকার বাজার সৃষ্টি হয়েছে।
সরিষা ফুলকে কেন্দ্র করে মধু উৎপাদনেও এগিয়ে সিরাজগঞ্জ। চলতি মৌসুমে ২৫৮টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৪ লাখ ৪ হাজার কেজি মধু সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, যার সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ১৪ কোটি টাকা। একক উপজেলা হিসেবে বরাবরের মতোই শীর্ষে রয়েছে উল্লাপাড়া।
কৃষিবিদরা বলছেন, এই সাফল্যের পেছনে তিনটি প্রধান কারণ রয়েছে। প্রথমত, চলনবিলের পলিমাটি। বর্ষার পানি নেমে যাওয়ার পর জমিতে যে পলি জমে, তা সরিষা চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। দ্বিতীয়ত, শীতল ও শুষ্ক আবহাওয়া, যা সরিষার ভালো ফলনে সহায়ক। তৃতীয়ত, সরকারের ‘তেলজাতীয় ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি’ প্রকল্পের আওতায় কৃষকদের বিনামূল্যে বীজ ও সার সরবরাহ।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের শীর্ষ পাঁচ সরিষা উৎপাদনকারী জেলার মধ্যে সিরাজগঞ্জ প্রথম, উৎপাদন ১ লাখ ২৮ হাজার টন। এরপর রয়েছে টাঙ্গাইল (১ লাখ ১৮ হাজার), রাজশাহী (৯৭ হাজার), মানিকগঞ্জ (৯২ হাজার) ও নওগাঁ (৮৮ হাজার)।
গত তিন বছরে দেশে সরিষা উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে যেখানে উৎপাদন ছিল ৮ লাখ ২৪ হাজার টন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা ১৬ লাখ টন ছাড়িয়ে যায়। এই অগ্রগতির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত ‘বারি সরিষা-২০’ জাত। বারির গবেষণা বিভাগের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা কাওছার উদ্দিন আহাম্মদ জানান, এ জাত মাত্র ৮৫ দিনে ঘরে তোলা যায় এবং সাধারণ জাতের তুলনায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেশি ফলন দেয়। আমন ও বোরো ধানের মধ্যবর্তী সময়ে জমি পতিত না রেখে এই জাত চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে।
তাড়াশ উপজেলার মাগুড়া গ্রামের কৃষক কালাম শেখ জানান, তিনি ১৫ বিঘা জমিতে সরিষা আবাদ করেছেন। প্রতি বিঘায় ৬ থেকে ৭ মন ফলন পাচ্ছেন। ইতোমধ্যে ১০ বিঘা কাটা হয়েছে, বাকিগুলোও কয়েক দিনের মধ্যে কাটা হবে। তিনি বলেন, এবছর ফলন ভালো হওয়ায় লাভের আশা করছেন।
তাড়াশ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ শর্মিষ্ঠা সেনগুপ্তা জানান, এ বছর উপজেলায় ৩০ হাজার ৪৭০ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে। প্রতি হেক্টরে গড়ে ১ দশমিক ৮৫ মেট্রিক টন উৎপাদন হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া ও কৃষকদের সচেতনতার কারণে বাম্পার ফলন পাওয়া গেছে। সরিষার ফুল ও পাতা জমির উর্বরতা বাড়াতেও সহায়ক বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সিরাজগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এ কে এম মনজুরে মাওলা বলেন, উন্নত জাত ও প্রকল্পভিত্তিক কারিগরি সহায়তার মাধ্যমে সরিষা উৎপাদন আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশের ভোজ্য তেলের চাহিদা মেটাতে এবং আমদানি নির্ভরতা কমাতে এই উৎপাদন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
উৎপাদিত সরিষার বড় অংশ সংগ্রহ করছে দেশের শীর্ষ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো। এতে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন এবং স্থানীয় অর্থনীতিতেও গতি সঞ্চার হচ্ছে।
Tags: সিরাজগঞ্জের সরিষা ক্ষেত