সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার চলনবিল অঞ্চলে বসেছে দেড়শ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী বারুহাস মেলা। স্থানীয় মানুষের কাছে এটি কেবল একটি গ্রামীণ মেলা নয়, বরং আত্মীয়তা, সংস্কৃতি ও সম্প্রতির মিলনমেলা।
তাড়াশ উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৬ কিলোমিটার পশ্চিমে বারুহাস বাজার চত্বরে প্রতিবছর চৈত্র মাসের ১৩ তারিখে এ মেলা অনুষ্ঠিত হয়। জমিদার আমল থেকেই এর প্রচলন।
আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, সেই ধারাবাহিকতায় এ বছরও শুক্রবার (৩ এপ্রিল) মেলার আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়েছে, যদিও আগের দিন বিকেল থেকেই লোকসমাগম শুরু হয়।
মূল মেলার পরদিন শনিবার বসে বিশেষ আকর্ষণ ‘বউ মেলা’, যেখানে আশপাশের গ্রামের নববধূ ও গৃহিণীরা প্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনাকাটা করেন।
বারুহাস মেলাকে ঘিরে রয়েছে নানা সামাজিক রেওয়াজ। এই অঞ্চলে ঝি-জামাইকে বাড়িতে আনার একটি অলিখিত প্রথা বহুদিন ধরে চলে আসছে। মেলা উপলক্ষে জামাইদের উপঢৌকন বা ‘পরবি’ দেওয়ার রীতি রয়েছে। আবার জামাইরাও সাধ্য অনুযায়ী বড় মাছ, মাংস ও মিষ্টি নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে আসেন। একসময় মেলার এক মাস আগে থেকেই গ্রামজুড়ে শুরু হতো প্রস্তুতি। বাড়ি লেপাপোছা, মুড়ি ভাজা, আত্মীয়-স্বজনকে দাওয়াত—বিশেষ করে নারীরা ব্যস্ত হয়ে পড়তেন নানা আয়োজনে।

স্থানীয় প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সত্তর থেকে নব্বই দশক পর্যন্ত বারুহাস মেলার সুনাম ছিল পুরো উত্তরবঙ্গজুড়ে। বগুড়া, শেরপুর, নাটোর, পাবনা এমনকি দূর-দূরান্তের এলাকা থেকেও মানুষ মহিষ ও গরুর গাড়ির বহর নিয়ে আসতেন। কেউ কেউ মেলার পাশে তাবু টানিয়ে কয়েক দিন অবস্থান করতেন। তখন ২৫ থেকে ৩০ গ্রামের মানুষের জন্য এ মেলাই ছিল বছরের সবচেয়ে বড় উৎসব।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মেলার জৌলুস কমতে শুরু করেছে। এখন এটি প্রায় বারুহাস গ্রামকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। নির্ধারিত জায়গার সংকট, পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং সহজলভ্য আধুনিক বাজারব্যবস্থা—এসব কারণেই মেলার আকর্ষণ কমেছে বলে মনে করেন স্থানীয়রা। এখন হাতের নাগালেই বড় বাজার ও শপিংমল, যেখানে দেশি-বিদেশি পণ্যের সমাহার। ফলে গ্রামীণ মেলার প্রতি আগের সেই টান আর দেখা যায় না।
তবুও বারুহাস মেলা কেবল কেনাবেচার জায়গা নয়; এটি গ্রামীণ জীবনের আবেগ, ঐতিহ্য ও সামাজিক বন্ধনের প্রতীক। চলনবিলের বিস্তীর্ণ জনপদের মানুষের কাছে এটি এখনও স্মৃতির অংশ, শিকড়ের টান।

সংস্কৃতিসচেতন মহলের মতে, এ ধরনের লোকজ মেলা আমাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক সম্পদ। যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা ও পরিকল্পিত উদ্যোগ না থাকলে একসময় এসব ঐতিহ্য হারিয়ে যাবে। তখন হয়তো বারুহাস মেলার নাম থাকবে শুধু ইতিহাসের পাতায় বা জাদুঘরে।
সিরাজগঞ্জের ঐতিহ্যের অংশ হয়ে টিকে থাকা এই বারুহাস মেলাকে জীবন্ত রাখতে এখনই উদ্যোগ নেওয়া সময়ের দাবি। গ্রামীণ সংস্কৃতির এই আলোকবর্তিকা নিভে গেলে, হারিয়ে যাবে আমাদের শেকড়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
Tags: তাড়াশ, বারুহাস মেলা