বাংলাদেশ ফুটবলের উজ্জ্বল নক্ষত্র হাসানুজ্জামান খান বাবলু-এর জীবনযাত্রা যেন এক অনুপ্রেরণার গল্প। সিরাজগঞ্জে স্কুল জীবনেই ফুটবলে প্রতিভার ঝলক দেখিয়ে ইন্টার-স্কুল পর্যায়ে রাজশাহী বিভাগের সেরা খেলোয়াড় হয়ে ওঠেন তিনি।
বাবা ছিলেন পুলিশের সার্কেল ইন্সপেক্টর, সিরাজগন্জ কলেজের মহিলা হোস্টেল ছিল বাবার অফিস ও তাদের বাসস্থান। সেই সুত্রে ভিক্টোরিয়া হাই স্কুল ও জয়নাল আবেদিন তালুকদারকে অনুসরণ করে অগ্রদূত ক্লাবে খেলা শুরু করেন।
পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এ পড়াশোনার পাশাপাশি ফুটবলে নিজেকে আরও শাণিত করেন বাবলু।
ঢাকার ক্লাব ফুটবলে ব্রাদার্স ইউনিয়ন-এর জার্সিতে খেলেই তিনি পান ‘ব্রাদার্সের বাবলু’ খ্যাতি। তার দুর্দান্ত ড্রিবলিং, গতি ও গোল করার ক্ষমতা তাকে পরিচিত করে আলাদা ভাবে। ঘরোয়া ফুটবলে হ্যাটট্রিকসহ প্রায় ৭৫টি গোল রয়েছে।

ঢাকার ফুটবল মাঠে তার ড্রিবলিং ছিল আইকনিক- যার সামনে দেশের নামকরা ডিফেন্ডাররাও প্রায়ই অসহায় হয়ে পড়তেন।
জাতীয় দলের জার্সিতে ১৯৭৫ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দল-এর হয়ে খেলেছেন তিনি। ১৯৮০ সালের এএফসি এশিয়ান কাপ ১৯৮০ এবং ১৯৭৫ সালের ঐতিহ্যবাহী মারদেকা কাপ-এ অংশগ্রহণ ছিল তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সেই সময় দক্ষিণ কোরিয়ার মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে বাংলাদেশের লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি ও তার সতীর্থরা।

খেলোয়াড়ি জীবন শেষে কোচিং ক্যারিয়ারেও সফলতার স্বাক্ষর রাখেন বাবলু। ২০০০, ২০০৩ ও ২০০৬ সালে অন্তর্বর্তীকালীন কোচ হিসেবে জাতীয় দলকে নেতৃত্ব দেন। এছাড়া বয়সভিত্তিক দল এবং ঐতিহ্যবাহী মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব-এর কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করে দল গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তার কোচিং দর্শন ছিল শৃঙ্খলা, ট্যাকটিক্যাল উন্নয়ন এবং তরুণ খেলোয়াড় তৈরি করা।
২০০৬ সালে ক্রীড়াক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারে ভূষিত হন, যা তার দীর্ঘ ক্যারিয়ারের স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত। মাঠের বাইরেও তিনি সমানভাবে সক্রিয়।
বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন, বাংলাদেশ ফুটবল কোচেস অ্যাসোসিয়েশন এবং সোনালী অতীত ক্লাব-এর সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত থেকে সাংগঠনিক ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তিনি সোনালী অতীত ক্লাবের সঙ্গে প্রতিষ্ঠাকাল থেকে যুক্ত থেকে দু’বার সভাপতি নির্বাচিত হন।
বর্তমানে জীবনের সায়াহ্নে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন-এর বোর্ডরুমে নতুন দায়িত্ব পালন করছেন এই কিংবদন্তি ফুটবলার। এছাড়া তিনি বাংলাদেশ তায়কোয়ানদো ফেডারেশন-এর সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন।
প্রায় ছয় দশক ধরে মাঠের ভেতরে ও বাইরে সমান প্রাণবন্ত থাকা হাসানুজ্জামান খান বাবলুর জীবন এক অনন্য উদাহরণ, যেখানে খেলোয়াড়, কোচ ও সংগঠক তিন ভূমিকাতেই তিনি রেখেছেন উজ্জ্বল স্বাক্ষর।
Tags: হাসানুজ্জামান খান বাবলু