আব্দুল্লাহ আল সাফি: আজ ২০ আগস্ট, মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশের ৪০তম মৃত্যুবার্ষিকী। ইতিহাসের পৃষ্ঠায় যাঁর নাম লেখা আছে সাহস, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের প্রতীক হিসেবে—তিনি শুধু সিরাজগঞ্জ নয়, ছিলেন গোটা জাতির পথপ্রদর্শক।
তর্কবাগীশ ১৯০০ সালের ২৭ নভেম্বর সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া উপজেলাধীন তারুটিয়া গ্রামে এক পীর বংশে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা হজরত আবু ইসহাক (রহ.) ছিলেন সুখ্যাত এক আধ্যাত্মিক পরিবারের সুযোগ্য উত্তরাধিকারী এবং তাঁর মাতা ছিলেন বেগম আজিজুন নেছা। শৈশব থেকেই আবদুর রশীদ তর্কবাগীশের মধ্যে দেশপ্রেমের উন্মেষ ঘটে। মাত্র ১৩ বছর বয়সে তিনি জমিদার মহাজনদের বিরুদ্ধে অসহায় দুধ বিক্রেতাদের সংগঠিত করে দুধের ন্যায্য মূল্য প্রদানে মহাজনদের বাধ্য করেন।
মাওলানা তর্কবাগীশের সলঙ্গার বাড়ি
তিনি উত্তর ভারতের দেওবন্দ মাদরাসায় শিক্ষালাভ করেন। লাহোরের এরশাদ ইসলামিয়া কলেজে বিতর্ক প্রতিযোগিতায় সেরা বাগ্মীর স্বীকৃতি লাভ করে তিনি ‘তর্কবাগীশ’ হিসেবে পরিচিত হন।
সলঙ্গা বিদ্রোহ: উপনিবেশবিরোধী চেতনার জাগরণ
১৯২২ সালে ২২ বছর বয়সে তিনি ব্রিটিশবিরোধী ঐতিহাসিক ‘সলংগা আন্দোলন’-এ নেতৃত্ব দান করেন, যার জন্য তাঁকে কারাভোগ করতে হয়। ব্রিটিশবিরোধী ‘বিলেতি পণ্য বর্জন’ আন্দোলনে সিরাজগঞ্জের সলঙ্গা হাটে সংঘটিত হয় ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ গণহত্যা।
সলঙ্গা বিদ্রোহে শহীদদের স্মৃতি ফলক রয়েছে সলঙ্গা হাটে
ব্রিটিশ বাহিনীর গুলিতে সেদিন প্রায় সাড়ে ৪ হাজার মানুষ হতাহত হন। এই ঘটনাকে পরবর্তীতে ‘রক্তাক্ত সলঙ্গা বিদ্রোহ’ নামে ইতিহাসে চিহ্নিত করা হয়। সেই বিদ্রোহের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ হয়ে আজও ইতিহাসে জ্বলজ্বল করছেন মাওলানা তর্কবাগীশ।
সলঙ্গা বিদ্রোহে শহীদদের স্মৃতি ফলক রয়েছে সলঙ্গা হাটে
ভাষা আন্দোলনে প্রথম প্রতিবাদকারী সংসদ সদস্য
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাজপথে ভাষার দাবিতে গুলিবিদ্ধ হওয়া ছাত্রদের হত্যার প্রতিবাদে পাকিস্তান আইন পরিষদে সর্বপ্রথম যিনি সরব হন, তিনি ছিলেন মাওলানা তর্কবাগীশ। তিনি সরকারের দমননীতি ও রক্তপাতের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানান। শুধু তা-ই নয়, ১৯৫৫ সালের ১২ আগস্ট পাকিস্তান গণপরিষদে তিনি প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রভাষা বাংলায় বক্তৃতা দেন।
রাজনীতির মঞ্চে অবিস্মরণীয় নেতৃত্ব
১৯৫৬ সাল থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বে খেলাফত আন্দোলন, কৃষক আন্দোলন, ১৯৪৭ সালে দেশভাগকালীন স্বাধিকার আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে তিনি মাদ্রাসা শিক্ষার উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন এবং মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে এই ব্যবস্থাকে আধুনিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক রূপদানের উদ্যোগ নেন। তাঁরই প্রচেষ্টায় রেডিও ও টেলিভিশনে প্রথম কোরআন তেলাওয়াত প্রচলনের ধারা চালু হয়।
১৯৭৬ সালের অক্টোবর মাসে তিনি ‘গণ আজাদী লীগ’ নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন এবং এ দলের সভাপতি নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৮৩ সালের ৩০ জানুয়ারি তার সভাপতিত্বে ১৫টি রাজনৈতিক দলের এক যৌথসভায় ১৫ দলীয় জোট গঠিত হয়। জোটের অন্যতম প্রধান নেতা হিসেবে তিনি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে বিশিষ্ট ভূমিকা রাখেন।
শেষ যাত্রা এবং অমর স্বীকৃতি
এই মহৎ জননেতা ও সিরাজগঞ্জের কৃতি সন্তান ১৯৮৬ সালে ঢাকার পিজি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল ৮৬ বছর। তাঁর মৃত্যু ছিল জাতির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। ২০০০ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করে।
মৃত্যুবার্ষিকীতে সিরাজগঞ্জের মানুষের আবেগঘন দাবি—তাঁর স্মৃতি অম্লান রাখতে সলঙ্গাকে বিশেষ প্রশাসনিক সন্মান ও তর্কবাগীশের বর্ণাঢ্য জীবনকে প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হবে।
————————————
ছবিতে মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশের কিছু স্মৃতি চিহ্ন
মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশের আদিবাড়ির বর্তমান অবস্থা
মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশের আদিবাড়ির পাশে পূর্বপুরুষদের কবর
মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশের আদিবাড়ির বর্তমান ভবনের বারান্দা
মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশের আদিবাড়ির বাইরে একটি কাচারিঘর, এখানে মাওলানার সঙ্গে আগত অতিথিরা সাক্ষাত ও অপেক্ষা করতেন
মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশের স্মৃতি পাঠাগার
মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশের হাতে লেখা একটি ডায়েরি থেকে সংকলিত একটি ঐতিহাসিক দলিল
Tags: মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ, মাওলানা তর্কবাগীশ, সলঙ্গা বিদ্রোহ