বাংলাদেশের ঘরোয়া ফুটবলে গোলরক্ষক পজিশনটি সবসময়ই চাপ, মানসিক দৃঢ়তা ও অভিজ্ঞতার পরীক্ষা। সেই কঠিন জায়গাটিই নিজের দৃঢ়তা, পরিশ্রম আর নেতৃত্ব দিয়ে আলোকিত করেছেন সিরাজগঞ্জ জেলার গোলরক্ষক আবুল কাশেম। জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপের এবারের আসরে তিনি শুধু পোস্টের নিচে দেয়াল হয়ে দাঁড়াননি, দলের মানসিক শক্তির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবেও কাজ করেছেন। আর তার পুরস্কার—টুর্নামেন্টের সেরা গোলরক্ষকের শিরোপা। সেইসঙ্গে ৬৪ জেলার মধ্যে সিরাজগঞ্জ জেলার দ্বিতীয় স্থান অর্জনও কম না।
শুরুর গল্প: আউটফিল্ড থেকে পোস্টের নিচে
কাশেমের ফুটবলযাত্রা শুরু হয়েছিল একেবারে সাধারণভাবে—পাড়ার মাঠ, স্কুলের টুর্নামেন্ট, বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল। শুরুতে তিনি আউটফিল্ড খেলোয়াড় ছিলেন। কিন্তু স্থানীয় কোচের তীক্ষ্ণ নজর তার অন্য সম্ভাবনাটি দেখেন। কোচের নির্দেশে গোলরক্ষকের গ্লাভস হাতে তুলে নিলে বদলে যায় তার ফুটবলজীবন।
দ্রুত বল পড়ার ক্ষমতা, রিফ্লেক্স এবং ঝুঁকি নিতে পিছপা না হওয়ার গুণ তাকে খুব কম সময়েই আলাদা করে দেয়।
জেলায় উত্থান: গোলপোস্টের নীরব নেতা
জেলা লিগে অভিষেকের পর থেকেই কাশেম হয়ে উঠেন সিরাজগঞ্জ দলের ভরসা। পেনাল্টি সেভ, অদম্য সাহস, ডিফেন্সকে জাগিয়ে রাখা, ম্যাচ রিডিং ক্ষমতাসহ সবকিছু মিলিয়ে তিনি দলের নীরব নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। মাঠে তার উপস্থিতিই ডিফেন্ডারদের বাড়তি আত্মবিশ্বাস দেয়।
জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে উজ্জ্বলতার গল্প
এবারের জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ কাশেমের ক্যারিয়ারে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। গ্রুপ পর্ব থেকে নকআউট, আর শেষ পর্যন্ত ফাইনাল—প্রতিটি ম্যাচেই তিনি ছিলেন নিখুঁত মনোযোগী। কঠিন মুহূর্তে তার সেভ, শেষমুহূর্তে অসাধারণ রিফ্লেক্স এবং পোস্টের নিচে দৃঢ় দাঁড়িয়ে থাকা সিরাজগঞ্জকে শুধু ম্যাচে রাখেনি, দলের মনোবলকেও ধরে রেখেছে।
ফাইনালের চাপ সামলেও দারুণ পারফরম্যান্স দেখিয়ে তিনি নিশ্চিত করেন টুর্নামেন্টের সেরা গোলকিপারের ট্রফি। পুরস্কারের মঞ্চে দাঁড়িয়ে ট্রফি উঁচিয়ে ধরা সেই মুহূর্তটি শুধু তার ক্যারিয়ারেরই নয়, সিরাজগঞ্জ ফুটবলেরও এক গৌরবময় অর্জন।
মাঠের বাইরে একজন অনুপ্রেরণাদায়ী মানুষ
কাশেমের ব্যক্তিত্ব খেলোয়াড়দের কাছে যেমন অনুকরণীয়, তেমনি দলের ভরসার জায়গা। অনুশীলনে অতিরিক্ত সময় দেওয়া, তরুণদের শেখানোর আগ্রহ, শৃঙ্খলা—সব মিলিয়ে তিনি মাঠের ভেতর-বাইরে সমান গুরুত্ববহ। তরুণ গোলরক্ষকরা তাকে দেখে শেখে—কীভাবে ধৈর্য রাখতে হয়, ব্যর্থতার পর মাথা তুলে দাঁড়াতে হয়। ফাইনালে দিনাজপুরের সঙ্গে লড়াই করে হেরে যাওয়ার পরে নিজের ফেসবুকে সিরাজগঞ্জবাসীর কাছে দু:খ প্রকাশ করে স্ট্যাটাস দিয়েছেন, যা তার নেতৃত্ব গুণকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
কাশেমের স্বপ্ন খুব স্পষ্ট। তিনি দেশের ঘরোয়া ফুটবলে আরও কয়েক বছর নিয়মিত খেলতে চান। আর বড় ক্লাবের হয়ে জাতীয় লিগে খেলার ইচ্ছা আছে তার।
পাশাপাশি নিজের জেলায় আরও যোগ্য গোলরক্ষক তৈরি করতেও আগ্রহী তিনি।
একজন গোলরক্ষক শুধু বল ধরেন না; তিনি দলের সাহস, স্থিরতা ও শেষ দেয়াল। কাশেম সেই দেয়ালকে আরও শক্ত করেছেন নিজের ধারাবাহিক পারফরম্যান্স, কঠোর পরিশ্রম আর দায়িত্বশীলতায়। জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে সেরা গোলরক্ষক হওয়া তার বহু বছরের আত্মত্যাগের স্বীকৃতি। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের ঘরোয়া ফুটবলে আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠবেন তিনি।
Tags: সিরাজগঞ্জ জেলা ফুটবল দল