‘একবার নিলে কিছু হবে না’—বন্ধুদের এমন কথায় কৌতূহল থেকেই মাদকের সংস্পর্শে এসেছিল রাকিব (ছদ্মনাম)। শুরুতে মাঝেমধ্যে, পরে সেটিই হয়ে ওঠে নিয়মিত। ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে তার আচরণ। কমে যায় পড়াশোনায় মনোযোগ, রাত করে বাড়ি ফেরার অভ্যাস তৈরি হয়, পরিবারের কাছে বাড়তি টাকা চাওয়া শুরু করে। টাকা না পেলে রাগারাগি, পরে বন্ধুদের কাছ থেকে ধার নেওয়া এমনকি পরিবারের জিনিসপত্র বিক্রির মতো পরিস্থিতিও তৈরি হয়।
পরিবার প্রথমদিকে বিষয়টি বুঝতে পারেনি। বুঝতে পারার পরও সামাজিক লজ্জায় কাউকে জানাতে চায়নি। চিকিৎসার উদ্যোগ নিতেও দেরি হয়েছে। ততদিনে রাকিবের স্বাভাবিক জীবন অনেকটাই এলোমেলো।
রাকিব কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির গল্প নয়। মাদকের ছোবলে পড়া অনেক তরুণের পরিস্থিতি বোঝাতে এটি একটি প্রতীকী চিত্র। দেশের বিভিন্ন এলাকায় এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে বহু পরিবার। এর বড় শিকার তরুণ সমাজ।
সিরাজগঞ্জ শহরের রহমতগঞ্জ গ্রামের যুবসমাজের উদ্যোগে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হয়েছে মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক সভা। সভায় তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখা এবং সামাজিকভাবে এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

মাদকাসক্তির শুরু সব সময় বড় কোনো ঘটনার মধ্য দিয়ে হয় না। অনেক সময় বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, কৌতূহল কিংবা ‘একবার চেষ্টা করে দেখি’—এমন মানসিকতা থেকেই প্রথমবার মাদকের সংস্পর্শে আসে তরুণরা।
শুরুতে অনেকেই মনে করে, চাইলেই ছেড়ে দেওয়া সম্ভব। কিন্তু নিয়মিত ব্যবহারের সঙ্গে ধীরে ধীরে নির্ভরশীলতা তৈরি হতে পারে। একসময় নেশা হয়ে উঠতে পারে দৈনন্দিন জীবনের অংশ।
কৈশোর ও তারুণ্যে বন্ধুদের প্রভাব, পারিবারিক অশান্তি, হতাশা, বেকারত্ব, উদ্দেশ্যহীন সময় কাটানো এবং মাদকের সহজলভ্যতা এ ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
একজন তরুণ মাদকে জড়িয়ে পড়লে এর প্রভাব প্রথমে দেখা যায় জীবনযাপনে। পড়াশোনা বা কাজে অনিয়ম, দায়িত্বহীনতা, ঘুমের পরিবর্তন, আচরণে অস্বাভাবিকতা এবং পরিবারের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হতে পারে।
ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা।
যে বয়সে একজন তরুণের শিক্ষা শেষ করে দক্ষতা অর্জন, কর্মজীবনে প্রবেশ কিংবা উদ্যোক্তা হওয়ার কথা, সেই সময়টিই চলে যেতে পারে নেশার পেছনে। হারিয়ে যায় সময়, অর্থ, সম্ভাবনা ও স্বপ্ন।
ফলে ক্ষতি শুধু ওই তরুণের নয়। একজন কর্মক্ষম মানুষকে হারায় পরিবার। এর প্রভাব পড়ে সমাজ ও অর্থনীতিতেও।
মাদকের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ জরুরি। তবে শুধু অভিযান কিংবা শাস্তির মাধ্যমে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন সচেতনতা, চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনের সমন্বিত উদ্যোগ।
একজন মাদকাসক্ত তরুণকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিলে সমস্যা আরও জটিল হতে পারে। তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে পরিবার, সমাজ ও চিকিৎসাব্যবস্থার সমন্বিত সহযোগিতা প্রয়োজন।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কার্যক্রমের মধ্যেও মাদকবিরোধী সচেতনতা সৃষ্টি, মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের বিষয়টি রয়েছে।
তবে প্রতিরোধের প্রথম জায়গা পরিবার। সন্তানের আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে তা অবহেলা না করে দ্রুত তার সঙ্গে কথা বলা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নেওয়া জরুরি।
কারণ মাদকের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর লড়াই শুরু হতে পারে প্রথমবারের আগেই।
একজন তরুণকে মাদক থেকে দূরে রাখা মানে শুধু একটি জীবনকে রক্ষা করা নয়, একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন এবং একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎকে রক্ষা করা।
Tags: মাদক বিরোধী অভিযান, রহমতগঞ্জ
পরবর্তী নিউজ লোড হচ্ছে...