তাড়াশে বোরো ধানের মৌসুমে তীব্র ডিজেল সংকট দেখা দিয়েছে। সেচের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে স্থানীয় বাজারে চাহিদা অনুযায়ী ডিজেল না পাওয়ায় উপজেলার হাজারো প্রান্তিক কৃষক চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। সময়মতো জমিতে পানি না দিতে পারায় একদিকে যেমন উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে ফসলের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) দুপুরে তাড়াশ পৌর শহরের কাউরাইল গ্রামের মাঠে দেখা যায়, কৃষক আব্দুল আজিজ মাত্র এক লিটার ডিজেল নিয়ে তার তিন একর জমিতে পানি দিতে এসেছেন। তিনি বলেন, “এক লাখ টাকা লোন নিয়ে আবাদ করেছি। এখন জমিতে পানির খুব দরকার, অথচ দোকানে ঘুরেও ডিজেল পাচ্ছি না। পানির অভাবে জমির মাটি শুকিয়ে যাচ্ছে, ধানের গাছে লালচে ভাব ধরেছে। এভাবে চললে পথে বসতে হবে।”
একই সমস্যা প্রকাশ করেন মাগুরা বিনোদ গ্রামের কৃষক আব্দুল মমিন। তিনি জানান, অনেক দোকানে তেল থাকলেও বিক্রি হচ্ছে না। কোথাও নির্ধারিত ১০৫ টাকার ডিজেল ১১০ থেকে ১১৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খুচরা বিক্রেতারা জানাচ্ছেন, পাইকারি পর্যায়েই তারা তেল পাচ্ছেন না।
কাউরাইল বাজারের তেল বিক্রেতা ইসমাইল হোসেন বলেন, “গত ১০ দিন ধরে সরবরাহ বন্ধ থাকায় আমরা ডিজেল বিক্রি করতে পারছি না।”
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এ বছর তাড়াশ উপজেলায় ২২,৯১০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এখান থেকে ১,৪২,৯১৬ মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে তেলের এই সংকট লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শর্মিষ্ঠা সেন গুপ্তা বলেন, “আমাদের কর্মকর্তারা মাঠ পর্যায়ে কাজ করছেন। কোথাও বেশি দামে ডিজেল বিক্রি হলে উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জরিমানা করা হচ্ছে।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুসরাত জাহান জানান, “ডিজেল বিক্রির দোকানগুলো নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে। কেউ যদি তেলের দাম বৃদ্ধি করে বাজারে বিক্রি করে, তাহলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
কৃষকরা আশা করছেন, স্থানীয় প্রশাসন ও বিপিসি দ্রুত এই সংকটের সমাধান করবে। স্থানীয় কৃষকদের মতে, সঠিক সময়ে সেচ না দিলে ধানের ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যার ফলে কৃষকদের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে এবং তাদের অর্থনৈতিক ক্ষতি হবে। অনেক কৃষক ইতিমধ্যেই আতঙ্কে রয়েছেন যে, এই পরিস্থিতিতে সঠিক সময়ে ফসল তোলার সম্ভাবনা সীমিত হয়ে যাবে।
সংকট মোকাবেলায় কিছু কৃষক বিকল্প উপায় খুঁজছেন, যেমন নিকটবর্তী পুকুর ও খালের পানি ব্যবহার করে সেচ দেওয়া। তবে এই উপায় সীমিত জমিতে কার্যকর হলেও বড় জমির জন্য পর্যাপ্ত নয়। স্থানীয় কৃষকরা সরকারী ও বেসরকারি পর্যায়ে দ্রুত সরবরাহ ব্যবস্থা পুনর্বহাল করার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন।
বোরো মৌসুমে ডিজেল সংকট শুধু তাড়াশেই নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্তিক এলাকায় কৃষকের উৎপাদন ও জীবনমানের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে। তাই কর্তৃপক্ষকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় এবং ফসলের ক্ষতি রোধ করা সম্ভব হয়।